আওয়ামী সিন্ডিকেটে পশুর হাট

By Unknown বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব, দিনকাল : আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার দুই সিটিতে এবারো সরকারদলীয় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ইজারা দেয়া হয়েছে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাটগুলো। সরকারি সিন্ডিকেটের কারণে ইজারা মূল্য কম দেয়ায় দুই সিটি বঞ্চিত হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব থেকে। ইজারা পাওয়ার পরই নির্ধারিত সময়ের আগেই ইজারাদাররা, ব্যানার, ফটক ও সামিয়ানা টানিয়ে শুরু করেছে পশু কেনা বেচা। এতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা ও নগরবাসীর চলাচলে ভয়ানক বিশৃংখলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। : নগরবাসীর কোরবানির পশু কেনার সুবিধার্থে প্রতিবছরই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন দুই ডজন অস্থায়ী পশুর হাট তিনি দিনের জন্য ইজারা দেন। ঈদের দিন ও ঈদের আগের তিনদিনের জন্য পশুর হাটের ইজারা দেয়া হলেও গত এক সপ্তাহ ধরেই হাট জমিয়ে শুরু হয়েছে বেচা কেনা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বার বার নির্ধারিত সময়ে ও নির্ধারিত স্থানে হাট বসানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া হলেও কেউ মানছে না নির্দেশনা। ইজারাদাররা সরকার দলীয় নেতা ও মোট অংকের টাকা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। ফলে হাটের নির্ধারিত স্থান ছাড়িয়ে আসপাশের বাড়ি ঘরের প্রাঙ্গণ, রাস্তা ও খালি জায়গা দখল করে হাট বসানোতে নগরবাসীর চলাচলে বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়েছে। : রাজধানীর দুই সিটির পশুর হাটে সরকারি দলের পুরোনো সিন্ডিকেট এবারও   কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে হাট দখল করে নিয়েছে। এর ধারে-কাছে ঘেঁষতে পারেননি প্রকৃত ব্যবসায়ীরা, ইজারা নেয়া তো বহুদূরের কথা। রাজধানীর খিলতে বনরূপা হাউজিংয়ের খালি জায়গাতে দূরদূরান্ত থেকে কোরবানির পশুবাহী ট্রাকগুলো এই বনরূপা হাউজিংয়ের হাটে এসে নামছে। মাঠ ছাড়িয়ে গরু আশপাশের রাস্তায় রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই হাট বসানোতে দুর্ভোগে পড়েছে এলাকাবাসী। বিভিন্ন জায়গায় বিক্রেতারা গরুগুলো নিয়ে শামিয়ানা টাঙিয়ে অবস্থান নিচ্ছেন। কেউ এসেছেন কুষ্টিয়া থেকে, কেউ টাঙ্গাইল, কেউবা পাবনা, সিরাজগঞ্জ থেকে। একেকজন বিক্রেতার কাছে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫টি ও সর্বনিম্ন দুই থেকে তিনটি গরু রয়েছে। এরই মধ্যে হাটে হাজার দেড়েক গরু এসেছে। কোরবানি ঈদের এখনো প্রায় এক সপ্তাহ বাকি। সারি সারি গরু এলেও বিক্রি নেই। কারণ ক্রেতা কম। বিক্রেতা বেশি। বিক্রেতারা গরু ছাড়তে চাইছেন না। দাম হাঁকাচ্ছেন দ্বিগুণের বেশি। ঈদের ১০ দিন আগ থেকেই থেকে হাটের প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গরু আসা শুরু হয়। এর মধ্যে কেবল একটি গরু বিক্রি হয়েছে বলে হাট কর্তৃপ জানায়। কুষ্টিয়া থেকে মো. এখলাস তিনটি বড় গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। একটি আনুমানিক চার মণ ওজনের। জানালেন, এই গরুটির জন্ম তার খামারেই। নিজেই লালনপালন করেছেন। দাম হাঁকাচ্ছেন ১০ লাখ টাকা। এত দাম কেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, নিজের পালা এই গরুটি এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে পারবেন না। : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেকটা প্রতিযোগিতাহীনভাবেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি কোরবানির পশুরহাটের মধ্যে ১৯টির ইজারা পেয়েছেন মতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী বা তাদের মদদপুষ্টরা। তিনটি হাট পেয়েছে তিনটি কাব। এসব কাবের নেতৃত্বে আছেন মতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা। অন্যান্য বছরের মতোই সিন্ডিকেট করে একচেটিয়াভাবে দরপত্র জমা দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিটি হাটের ইজারা বাগিয়ে নিয়েছেন। এসব সিন্ডিকেটে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেশ কয়েকজন ডনও রয়েছেন। : অনুসন্ধানে জানা যায়, এক কোটি ২৫ লাখ টাকায় উত্তরা ১৫ ও ১৬ নং সেক্টরের মধ্যবর্তী ব্রিজসংলগ্ন খালি জায়গার হাট পেয়েছেন উত্তরা থানা আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম, দুই কোটি ৪১ লাখ টাকায় খিলতে বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের হাট পেয়েছেন খিলতে থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম, ৫১ লাখ টাকায় মিরপুর সেকশন-৬, ওয়ার্ড নং-৬ ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গার হাট পেয়েছেন ছাত্রলীগের ১৪ নম্বর (সাবেক) ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লেয়াকত আলী। পরে তার কাছ থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য হাটটি সাব-কন্ট্রাক্ট নেন। এক কোটি ৬০ লাখ টাকায় ভাসানটেক বেনারসি পল্লি মাঠ ও সংলগ্ন খালি জায়গার হাট পেয়েছেন ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম মনোয়ারুল ইসলাম, এক কোটি এক লাখ টাকায় বাড্ডা (ইন্দুলিয়া-দাউকান্দি বাঘাপুর) হাট পেয়েছেন ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ উত্তরের সাবেক সহ-সভাপতি রায়হান, এক কোটি ২৫ লাখ টাকায় আশিয়ান সিটি হাউজিং হাট পেয়েছেন বিমানবন্দর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মো. রবিউল ইসলাম (রবি)। ভাটারা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদ খন্দকারের সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ভাটারা (সাইদনগর) হাট পেয়েছেন মো. সেলিম হোসেন। আর গাবতলীর স্থায়ী পশুরহাটটি বরাবরের মতো স্থানীয় সংসদ সদস্যের (আসলামুল হক) মদদপুষ্ট মো. লুৎফর রহমান পেয়েছেন। : অপরদিকে ডিএসসিসির হাটগুলোতে দেখা যায়, ৬৬ লাখ ১০ হাজার টাকায় জিগাতলা হাজারীবাগ এলাকার হাট পেয়েছেন হাজারীবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক মনিরুল হক বাবু। তিনি দলের নতুন কমিটিতে সহ-সভাপতির পদ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। ৫১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় মেরাদিয়া বাজার খিলগাঁও এলাকার হাট পেয়েছেন ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম। এক কোটি ৫৫ লাখ টাকায় সাদেক হোসেন খোকা মাঠ ধোলাইখালের হাট পেয়েছেন ৪২ নম্বর ওয়ার্ড (সাবেক ৭৮) যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ভূইয়া বাবু। ৭ লাখ ২০ হাজার টাকায় উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজার সংলগ্ন হাট পেয়েছেন শাহজাহানপুর ১১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভপতি হাজী আব্দুল লতিফ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের যোগসাজশে ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় পোস্তগোলা শ্মশাঘাট সংলগ্ন হাট পেয়েছেন মো. আসাদুজ্জামান রুবেল। এক কোটি ৬ লাখ টাকায় লালবাগের মরহুম হাজী দেলোয়ার হোসেন খেলার মাঠ, বেড়িবাঁধ এবং তৎসংলগ্ন খালি জায়গা ও আশপাশের এলাকার হাট পেয়েছেন মো. ইউসুফ। মতাসীন দলের স্থানীয় নেতারাও এতে অংশীদার। ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কামরাঙ্গীরচর ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় থেকে দণি দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধসংলগ্ন এলাকার হাট পেয়েছেন কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন সরকার। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে ৭৫ লাখ টাকায় ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারের ভেতরের হাট পেয়েছেন আবু বকর সিদ্দিক বাকের। ৩৮ লাখ ২০ হাজার টাকায় কমলাপুর স্টেডিয়ামের আশপাশে খালি জায়গার হাট পেয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা মো. আমের খান। এর আগে এ হাটের জন্য আরামবাগের ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক অংশগ্রহণ করায় পুনঃদরপত্র আহ্বান করে ডিএসসিসি। এক কোটি ৩৩ লাখ টাকায় দনিয়া কলেজ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গা যাত্রাবাড়ী হাট পেয়েছেন সাবেক ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ। ১৪.৪১ লাখ টাকায় শ্যামপুর বালুর মাঠের হাট পেয়েছেন ঢাকা মহানগর দণি যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএম মাসুদ রানা। এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকায় লালবাগের রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ হাট পেয়েছেন কাবটির সভাপতি শফি মাহমুদ। ৯৩ লাখ টাকায় ধূপখোলার ইস্ট অ্যান্ড কাব মাঠের হাট পেয়েছেন কাবের যুগ্ম-আহ্বায়ক মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী। এক কোটি ৯৮ লাখ টাকায় ব্রাদার্স ইউনিয়ন সংলগ্ন বালুর মাঠের হাটটি পেয়েছেন একেএম মমিনুল হক সাঈদ। তবে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম ও ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহম্মেদের বলেন, সর্বোচ্চ দরদাতাকেই হাটের ইজারা দেয়া হয়েছে। : দুই সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, এবার ঈদুল আজহা উপলে ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১৮টি কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাট বসার সিদ্ধান্ত ছিল। এরমধ্যে ঢাকা দণি সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ছিল ১১টি ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৭টি। দুটি হাট বাতিল করায় এখন বসবে ১৬টি। হাটগুলোর কাক্সিত দর না পাওয়ায় একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। অবশ্য প্রথম থেকেই দুই সিটির কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সিন্ডিকেট কম দামে হাট নিতে নানা কৌশল নিয়ে বার বার টেন্ডারে অংশ নেয়। সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মানুযায়ী ঈদের তিন দিন আগে বসবে এসব হাট। চলবে ঈদের দিন পর্যন্ত। তবে সরেজমিন দেখা গেছে, নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বেশ কয়েকটি হাট অবৈধভাবে জায়গা বাড়াচ্ছে। এছাড়া গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটটিও কোরবানির জন্য আশপাশের অনেক এলাকা ঘিরে আছে। সিন্ডিকেট করে পশুর হাটের ইজারা নেয়ায় একদিকে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের আগেই পশুর বাজার বসানো ও আশপাশের খালি জায়গা রাস্তা দখল করায় জনগণের দুর্ভোগ বেড়েছে।

dailydinkal
Jillur Rahman

I'm Jillur Rahman. A full time web designer. I enjoy to make modern template. I love create blogger template and write about web design, blogger. Now I'm working with Themeforest. You can buy our templates from Themeforest.