বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকেও টিউশন ফি আদায়! নির্দেশ মানছে না অনেক নামি স্কুল

By Unknown মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০১৬
যারা প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় বৃত্তি পাবে তাদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করা যাবে না—সরকারের এমন কঠোর নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না বেসরকারি নামি স্কুলগুলো। ভর্তি ফি, নিবন্ধন ফি, উন্নয়ন ফি, টিউশন ফিসহ সবধরণের ফি-এর টাকাই বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করছে এসব প্রতিষ্ঠান। ফলে বৃত্তি পাওয়ার মাধ্যমে ততটা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না স্বীকৃত এসব মেধাবীরা।

রাজধানীর ভিকারুন-নিসা নূন, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন নামি প্রতিষ্ঠানে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পুরো মাসিক বেতন (টিউশন ফি) দিতে হচ্ছে। রাজধানীর বাইরেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই প্রবণতা রয়েছে। রংপুরের পুলিশ লাইনস স্কুলসহ অনেক স্কুলে বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকে অর্ধেক টিউশন ফি আদায় করা হচ্ছে।

অথচ বৃত্তির বিষয়ে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, সকল মেধাবৃত্তি ও সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করবে।  সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ও শিক্ষাবোর্ডের অধিভুক্ত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসিক বেতন (টিউশন ফি) আদায় করতে পারবে না। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন (টিউশন ফি) আদায় করলে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে বিধি ভঙ্গের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যান্য শিক্ষাবোর্ডেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে টিউশন ফি আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনই ব্যবস্থা নেয়নি শিক্ষাবোর্ড বা শিক্ষা অধিদপ্তর।

যার স্বাক্ষরে বোর্ডের এই আদেশ তিনি ঢাকা বোর্ডের সচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকে কোন টিউশন ফি নেয়া যাবে না, এমন নির্দেশনা দিয়েছি। টিউশন ফি আদায় করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। তিনি বলেন, কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে টিউশন ফি নেয়ার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, এটা অনিয়ম। বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করা যাবে না। পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ করুন। তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল ৫ম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পুরো টিউশন ফি আদায় করছে। এ ক্ষেত্রে বোর্ডের নির্দেশনা না মানার বিষয়ে অভিভাবকদের কাছে কৈফিয়ত দিতেও রাজি নন স্কুল কর্তৃপক্ষ। বৃত্তি পেয়েছেন এমন অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদকে জানিয়েছে, তাদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করা হচ্ছে। তারা জানিয়েছে, বৃত্তিপ্রাপ্ত সব শিক্ষার্থীকেই টিউশন ফি দিতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ সুফিয়া খাতুন বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকে টিউশন ফি নিচ্ছি। এটা আমাদের প্রচলিত নিয়ম। এ প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়। তাদের বিনা বেতনে পড়াতে গেলে শিক্ষকদের বেতন দিতে পারবো না। এ ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনার বিষয়টি অবহিত করা হলে এই শিক্ষক বলেন, আমাদের এ বিষয়ে কিছুই বলার নেই। অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ অনেকে নানা খাত দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা ভাতা তুলে নেন। তারপরও তারা বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করছেন। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন খাতে বিপুল অংকের আর্থিক অনিয়ম করছে এমন তথ্যও রয়েছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কাছে।

রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চিত্র একই। বৃত্তিপ্রাপ্ত সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টিউশনফিসহ সব ধরণের ফি আদায় করা হচ্ছে এখানে। টিউশন ফি মওকুফ করার নির্দেশনা থাকার পরও কেন টিউশন ফি নেয়া হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শাহান আরা বলেন, এ প্রতিষ্ঠান থেকে ৬০-৭০ জন সাধারণ বৃত্তি পায়। এদের তিন বছর বিনা টিউশন ফিতে পড়াতে হলে অনেক টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। তাই টিউশন ফি নিচ্ছি।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, এ স্কুলগুলোর প্রধানরা নানা কৌশলে বাড়তি টাকা নিচ্ছে। গভর্নিং বডির সভায় লাখ লাখ টাকা ব্যয় করছে। আপ্যায়নের নামে, পরীক্ষার দায়িত্ব ভাতার নামেও তুলে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। অথচ সরকারি আদেশ মেনে বিনাবেতনে পড়াতেই তাদের আপত্তি।

মিরপুরের মনিপুর স্কুলেও টিউশন ফি আদায় করা হচ্ছে বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকে। এছাড়া কোচিংফিসহ অন্যান্য ফিতো আছেই। প্রতিষ্ঠানটিতে ৩০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বছরে আদায় হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। অথচ বৃত্তিপ্রাপ্তদের বিনা টিউশন ফিতে পড়াতে আপত্তি তাদের। এ বিষয়ে জানার চেষ্টা করলে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন এর মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

রংপুরের পুলিশ লাইনস স্কুলের বৃত্তিপ্রাপ্ত এক শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তাদের মাসিক বেতন ১৫শ টাকা। কিন্তু বৃত্তি পাওয়ার পর মাত্র অর্ধেক টিউশন ফি মওকুফ করা হয়েছে।

এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান গোপনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করছে তা তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে বলেন অভিভাবকরা।

তবে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করছে না জানিয়েছেন সিদ্ধান্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম। শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, সরকারি নির্দেশ মেনে চলছি। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন টিউশন ফি আদায় করছি না।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে তিনজন ছাত্র ও তিনজন ছাত্রীকে প্রাথমিকের সাধারণ ক্যাটাগরিতে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। আর ট্যালেন্টপুলের বৃত্তি নির্ধারিত হচ্ছে উপজেলার পরীক্ষার্থীর সংখ্যার হিসেবে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ২০১৫ সালের পরীক্ষায় এবার বৃত্তি পেয়েছে ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ট্যালেন্টপুলে (মেধা কোটায়) বৃত্তি পেয়েছে ৩৩ হাজার ও সাধারণ কোটায় পেয়েছে ৪৯ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী।  ট্যালেন্টপ্রাপ্তদের এবার প্রতি মাসে তিনশ’ টাকা করে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ কোটায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের দুইশত পঁচিশ টাকা করে দেয়া হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ১৫০ টাকা।

জেএসসিতে মেধাবৃত্তি পেয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী। সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী।  এছাড়া অষ্টম শ্রেণীর মেধাবৃত্তি পাওয়ার শিক্ষার্থীরা মাসিক সাড়ে ৪৫০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্তরা ৩০০ টাকা করে পাচ্ছে। এছাড়া বই ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করার বাবদ অনুদান হিসাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বছরে ৫৬০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্তরা বছরে ৩৫০ টাকা করে পাচ্ছে। এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় না করতে বোর্ডের নির্দেশনা রয়েছে।

- ইত্তেফাক
Jillur Rahman

I'm Jillur Rahman. A full time web designer. I enjoy to make modern template. I love create blogger template and write about web design, blogger. Now I'm working with Themeforest. You can buy our templates from Themeforest.